কারখানায় অগ্নিকাণ্ড রোধে বিআইপির ১৪ প্রস্তাবনা

কারখানায় অগ্নিকাণ্ড রোধে বিআইপির ১৪ প্রস্তাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক : নারায়ণগঞ্জ রূপগঞ্জে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে বহু হতাহতের ঘটনাকে ‘হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছেন পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, মুনাফা লাভের আকাঙ্খায় মানুষের দারিদ্র্যকে পুঁজি করে শিল্প শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন করছে মালিকরা। এখনই এর লাগাম টানতে হবে। এজন্য রাষ্ট্রকে নজর দিতে হবে। তবে ব্যর্থ হলে এ ধরণের হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকবে।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) উদ্যোগে অনলাইনে আয়োজিত ‘নারায়ণগঞ্জের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের দায় ও করণীয়’ শীর্ষক পরিকল্পনা সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫২ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। এখনো অনেক শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্বজনদের দাবি।

সংলাপে বক্তারা বলেন, শিল্প-কারখানা নির্মাণে বিল্ডিং কোড ও ফায়ার কোড অনুসরণ না করা, রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার নির্দেশিত ভূমি ব্যবহার প্রস্তাবনার সুস্পষ্ট ব্যত্যয় করা, ভবন ও অগ্নি নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন ও বিধিমালাসমূহের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, অগ্নি মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাব, কারখানা তদারকির সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাসমূহের প্রকৃত নজরদারির অভাব- প্রভৃতি অনুষজ্ঞসমূহ নারায়ণগঞ্জের অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ যাকে হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করা যায়।

সংলাপে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার আলী আহমেদ খান বলেন, বিল্ডিং কোড, ফায়ার কোড এবং পরিকল্পনার অনুসরণ ছাড়া কোন ভবন তৈরি করা হলে তার ঝুঁকি থেকেই যায়। অনেক জায়গায় বিল্ডিং কোড অনুসরণ করলেও ফায়ার কোড অনুসরণ করা হয় না, যার ফলে অগ্নিকাণ্ডের সময় রাস্তা না থাকার জন্য ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারে না।

তিনি বলেন, পোশাক কারখানার পাশাপাশি, দেশে যে সকল প্লাস্টিক, খাদ্য এবং বিভিন্ন প্রকার কারখানা রয়েছে সেখানে বিল্ডিং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করতে হবে, যাতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় এবং সেই সাথে জবাবদিহিতা ও নজরদারি বাড়ানোর মাধ্যমে এসব মানবসৃষ্ট দূর্যোগ মোকাবেলা করতে হবে।

নারায়ণগঞ্জের হাশেম কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মালিক, কারখানার ব্যবস্থাপক এবং কারখানার নির্মাণ ও তদারকির সাথে সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি কর্তৃপক্ষসমূহকে সমভাবে দায়ী করেন শ্রম মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মিকাইল শিপার।

সাবেক এই সচিব বলেন, মালিকদের পাশাপাশি কলকারখানা পরিদর্শনের সাথে যুক্ত কর্মকর্তারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটার কথা ছিল না।

বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ভবন নির্মাণের অনুমতি থেকে শুরু করে ব্যবহার, সকল ক্ষেত্রে প্রফেশনাল কোড অব এথিক্স মানা হচ্ছে না; ফলশ্রুতিতে সকল ইমারত, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিপদজনক হয়ে উঠছে।

সংলাপের মূল বক্তব্যে বিআইপি’র সাধারণ সম্পাদক ও পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকা মহানগর এলাকায় বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে অধিকাংশ শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। কৃষি জমি কিংবা আবাসিক এলাকায় ন্যূনতম অবকাঠামো নিয়ে গড়ে উঠা এ সকল কারখানাগুলো প্রতিনিয়ত মৃত্যুকূপ হয়ে দেখা দিচ্ছে।

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আশিকুর রহমান বলেন, লোভ ও দুর্নীতি, সক্ষমতার অভাব, আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করার অভাব এবং কর্তৃপক্ষকে বিচার ও দায়বদ্ধতার মধ্যে নিয়ে আসার অভাব এসবই মানব সৃষ্ট অগ্নি দূর্যোগের প্রধান কারণ।

ইউএনডিপি বাংলাদেশের ন্যাশনাল কনসালটেন্ট এবং ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন বিশেষজ্ঞ পরিকল্পনাবিদ মো. আনিসুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনা ঘটার কারণ হিসেবে পেশাগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে ভবন ব্যবহারকারী, মালিক ও সংশ্লিষ্ট সকলের মনস্তত্ব, বিশেষতঃ দূর্যোগের সময়কালীন আচরণ বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

শিল্প স্থাপনা নকশাকার পরিকল্পনাবিদ স্থপতি মোহাম্মদ আমিমুল এহসান বলেন, রাজনৈতিক অর্থনীতির নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

বিআইপি’র যুগ্ম সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ রাসেল কবীর বলেন, বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট সকলের গাফিলতি এবং কারখানা তৈরিতে পরিকল্পনা ও নির্মাণ স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ না করার ফলেই দুর্ঘটনা ঘটছে।

বিআইপি’র সহ সভাপতি পরিকল্পনাবিদ মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, শিল্প কারখানার নিরাপত্তা সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে সরকারি-বেসরকারি সকল অংশীজনসহ পেশাজীবীদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে সকল শিল্পকারখানাকে কমপ্লায়েন্স এর মধ্যে আনতে হবে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এর নগর পরিকল্পনাবিদ মো. মঈনুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা একান্ত দরকার।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কর্তৃক প্রণীত ড্যাপ এর প্রকল্প পরিচালক পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, সামগ্রিকভাবে শহরকে নিরাপদ করতে ভবন তদারকি ও অনুমোদন সংস্থাসমূহের দায়িত্ব ও করণীয়সমূহ সুস্পষ্টকরণ করতে হবে এবং একইসাথে শিল্পকারখানার ইমারত নকশা ও নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদেরও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।

সংলাপে শিল্প-কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রোধ এবং শ্রমিকের জীবনের সুরক্ষার পাশাপাশি উপযুক্ত কর্ম-পরিবেশ নিশ্চিত করতে ১৪টি প্রস্তাবনা উত্থাপন পেশ করে বিআইপি।

এগুলো হলো

১. শিল্প কারখানাসহ ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড, ফায়ার কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করা।

২. শিল্প কারখানা ও শ্রম সংক্রান্ত সকল আইন ও বিধিবিধানের প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

৩. মাস্টার প্ল্যানে শিল্প এলাকা যথাযথভাবে চিহ্নিত করবার মাধ্যমে পরিকল্পনা অনুযায়ী শিল্প এলাকায় শিল্প কারখানা গড়ে তোলা এবং অনুমোদনহীন কারখানার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৪. অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিতে শিল্প কারখানায় ফায়ার এলার্ম, ফায়ার এক্সটিংগুইশার, ফায়ার স্প্রিংকলারসহ আধুনিক ফায়ার ফাইটিং উপকরণ নিশ্চিত করা।

৫. পর্যাপ্ত সংখ্যক জরুরি প্রস্থান পথ নিশ্চিত করবার পাশাপাশি ভবনে পর্যাপ্ত আলো ও বায়ু চলাচলের বিধান রাখা।

৬. বৈদ্যুতিক ইন্সটলেশনসহ সকল পরিসেবায় পর্যাপ্ত মানদণ্ড বজায় রাখা।

৭. রাসায়নিকসহ সকল দাহ্য পদার্থ গুদামজাত করবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নীতিমালা অনুসরণ করা।

৮. মালিক-শ্রমিক-সরকার সমন্বয়ে শিল্প কারখানার কর্ম পরিবেশ ও নিরাপত্তা নজরদারির লক্ষ্যে ত্রিপাক্ষিক কমিটি তৈরি করা।

৯. কল কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নজরদারি কার্যক্রম নিশ্চিত করা এবং এই প্রতিষ্ঠানসহ কারখানার নিরাপত্তা ও নিরাপদ কর্ম পরিবশ নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা।

১০. শ্রম পরিদর্শন সংক্রান্ত জাতীয় কৌশলপত্রের প্রস্তাবনাসমূহ অচিরেই বাস্তবায়ন করা।

১১. অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মালিক, কারখানার ব্যবস্থাপক এবং কারখানার নির্মাণ ও তদারকির সাথে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীসহ সকল সরকারি কর্তৃপক্ষসমূহকে তদন্তের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা।

১২. ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এ অগ্নি নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত প্রবিধানগুলোর পূণর্বীক্ষণের মাধ্যমে যুগোপযোগী করা। নতুন কোড এ বহুতল ভবনের উচ্চতা নির্ধারণে বর্তমানে প্রস্তাবিত ১০ তলার অধিক ভবনের বদলে ৬ তলার অধিক ভবনকে বহুতল ভবন সংজ্ঞায়িত করে অগ্নি নিরাপত্তার প্রবিধান নিশ্চিত করা।

১৩. সামাজিক নিরাপত্তা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রেখে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবার মাধ্যমে শিশুশ্রম ও নিম্ন মজুরির মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগের সুযোগ বন্ধ করবার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।

১৪. ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এর প্রস্তাবিত বিল্ডিং অথরিটি দ্রুত গঠনের মাধ্যমে দেশের সকল এলাকায় ভবন নির্মাণে শৃঙ্খলা ও নির্মাণ কোড অনুসরণ নিশ্চিত করা।

More News...

জাতীয় প্রেসক্লাবে বিড়ি শ্রমিকদের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন

কৃষকদের টাকা দিলে ফেরত দেয়, কোটিপতিরা দেয় না’