রূপগঞ্জে অগ্নিকাণ্ড: সাত ক্লু ধরে তদন্ত শুরু, নিখোঁজদের তালিকা প্রকাশ

রূপগঞ্জে অগ্নিকাণ্ড: সাত ক্লু ধরে তদন্ত শুরু, নিখোঁজদের তালিকা প্রকাশ

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি : নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাশেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জন নিহতের ঘটনায় ৭ ক্লু ধরে তদন্ত শুরু হয়েছে।

জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের কারণ, ক্ষয়ক্ষতি, প্রাণহানির ঘটনার অনুসন্ধানে একাধিক তদন্ত টিম কাজ করছে। প্রাথমিক ভাবে ৭টি ‘ক্লু’ ধরে অনুসন্ধান শুরু হলেও তদন্তে আরও অনেক সম্পূরক বিষয়ে উঠে আসছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন দেশ রূপান্তরকে এমনটা জানিয়েছেন।

ভবন নির্মাণে ত্রুটি, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকা, দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি, শিশু শ্রম, ফ্লোর তালাবদ্ধ রাখা, ১ জুলাই শ্রমিকদের বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলন, ১১২জন এস আরকে চাকরিচ্যুত করে তাদের মোটরসাইকেল নিলামে বিক্রি, এসব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চলছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা প্রাথমিক ভাবে ভবনের অনুমোদন না থাকা ও আগুন নেভানোর ব্যবস্থা ছিল না বলে প্রমাণও পেয়েছে ।

শনিবার জেলা প্রশাসন কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান মো. শামীম ব্যাপারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বেশ কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছি। তবে তদন্তাধীন বিষয়ে এই মুহূর্তে কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করে যথাসময়ে জানানো হবে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছে। কারখানার মালিক সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ হাশেম ও তার ৪ ছেলেসহ ৮ জনকে আটকের পর ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ৪ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছেন, রূপগঞ্জের ঘটনায় ন্যূনতম গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অগ্নিকাণ্ডের ফলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া কারখানাটিতে লাশের খোঁজে শনিবারও সকাল থেকে তল্লাশি চালায় ফায়ার সার্ভিস। দীর্ঘ সময় ধরে কারখানাটি আগুন না নেভার কারণে অনেক স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে, ভবনের কয়েকটি স্থান দেবেও গেছে। ফলে ভবনটি ধসে পড়ার আশঙ্কা করছে ফায়ার সার্ভিস।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. জায়েদুল আলম জানান, সেজান জুস কারখানায় আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছেন। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত কোথা থেকে, কী কারণে আগুন এমন ভয়াবহ রূপ নিল, এত শ্রমিকের প্রাণহানি কেন ঘটল, আগুন লাগার পর শ্রমিকরা কারখানা থেকে কেন বের হতে পারেননি, এটা শুধু দুর্ঘটনা নাকি অন্য কিছু, কারখানা নির্মাণে ত্রুটি ছিল কি-না ও মালিকপক্ষের গাফিলতি কতটুকু সব বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে। দোষীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

শনিবার ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক মো. তানহার বলেন, শুক্রবার দুপুরে ৫০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে আগুন থেকে বাঁচতে ভবন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তিনজনের মৃত্যু হয়। শনিবার নতুন করে কোনো লাশ পাওয়া যায়নি। তবে তারা খুঁজে দেখছেন আর কারও লাশ পাওয়া যায় কি-না। একই সঙ্গে পানি ছিটানো ভবনের প্রতিটি তলায়। যাতে নতুন করে কোথায়ও আগুনের সৃষ্টি না হয়।

এ দিকে ভবনের কিছু অংশ দেবে গেছে এবং ফাটল দেখা দিয়েছে জানিয়ে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, ভবনের ষষ্ঠ তলা ও ছাদের কিছু অংশ দেবে গেছে। ধসে পড়েছে ষষ্ঠ তলার একটি অংশ। ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে জানান তিনি।

নিহতদের পরিচয় জানতে এক মাস সময় লাগতে পারে, এমনটাই জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ডিএনএ পরীক্ষক মোহাম্মদ মাসুদ রাব্বী সবুজ। শনিবার এ তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত ২৬ টি মরদেহের বিপরীতে ৩৫ জন দাবিদারের নমুনা সংগ্রহ করেছি। এখনো সব দাবিদার আসেননি। তারা এলে পর্যায়ক্রমে তাদের নমুনা নেয়া হবে। একই সঙ্গে যাদের নমুনা নেয়া হয়েছে সেগুলো ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। সব মিলিয়ে আশা করা যায় এক মাস সময়ের মধ্যে পরিচয়গুলো আমরা শনাক্ত করতে পারব।’

নিহতদের পরিচয় রূপগঞ্জ থানা ও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে জানা যাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নিহতদের পরিচয় রূপগঞ্জ থানা ও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে জানতে পারবেন স্বজনরা। তারা এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট। তাদের মাধ্যমে পরিবারগুলো তথ্য পেতে পারে।

মোহাম্মদ মাসুদ রাব্বী আরও বলেন, ‘আমরা রেফারেন্স নমুনা সংগ্রহ করছি। মৃত ব্যক্তির দাবিদাররা এসেছেন। তাদের কাছ থেকে রক্ত নিচ্ছি। ডেডবডির দাঁত ও হাড় সংগ্রহ করা হয়েছে। এই ধরনের নমুনাগুলো আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করব।’

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবি আই) ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত জব্দ করেছে। কারখানায় কর্মরত শ্রমিক থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তারা। আগুন লাগার পেছনে অন্য কোনও কারণ আছে কি-না তা অনুসন্ধানের চেষ্টা চলছে।

করোনা সংক্রমণ রোধে কঠোর লকডাইন শুরুর প্রথম দিন বকেয়া বেতন ও ভাতার দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করেন সেজান জুস কারখানার শ্রমিকরা। তার এক সপ্তাহের মাথায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল।

কারখানার একাধিক শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেজান জুস কারখানায় শ্রমিকদের এক মাসের বেতন বকেয়া রেখে চলতি মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়। অর্থাৎ, সব সময়ই এক মাসের বেতন বকেয়া থাকে। যে কারণে বেতন পরিশোধের দাবি জানিয়ে আসছিলেন তারা। কিন্তু মালিকপক্ষ তাতে কর্ণপাত করেনি। এতে শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে বকেয়া বেতন ও ওভারটাইমের টাকার দাবিতে গত ১ জুলাই শ্রমিকরা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।

তাই, মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্বের কারণে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে কি-না, সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

নিখোঁজদের তালিকায় যারা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ফিরোজা, তার মেয়ে সুমাইয়া, উপজেলার গোলাকান্দাইল আফজালের স্ত্রী নাজমা বেগম, গোলাকান্দাইল খালপাড়ের রাজিবের স্ত্রী আমেনা, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার গোলামের ছেলে মো. মহিউদ্দিন, একই উপজেলার ফখরুল ইসলামের ছেলে শামীম, ভোলা জেলার ইসমাইলের মেয়ে হাফেজা, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার তাহের উদ্দিনের ছেলে নাঈম, একই জেলার নিতাই উপজেলার স্বপনের মেয়ে শাহিদা, মৌলভীবাজারের পরবা বরমনের ছেলে কমপা বরমন, ভোলার তাজুদ্দিনের ছেলে রাকিব, কিশোরগঞ্জের কাইয়ুমের মেয়ে খাদিজা, নেত্রকোনার জাকির হোসেনের মেয়ে শান্তা মনি, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার সেলিমের স্ত্রী উর্মিতা বেগম, কিশোরগঞ্জের কাইয়ুমের মেয়ে আকিমা, নেত্রকোনার কবির হোসেনের মেয়ে হিমা, রংপুরের মানসের ছেলে স্বপন, কিশোরগঞ্জের মাহাতাব উদ্দিনের স্ত্রী শাহানা, কিশোরগঞ্জের আব্দুর রশিদের মেয়ে মিনা খাতুন, পাবনার হাঠখালির শাহাদত খানের ছেলে মোহাম্মদ আলী, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ফজলুর ছেলে হাসনাইন, জামালপুরের মো. শওকতের ছেলে জিহাদ রানা, কিশোরগঞ্জের মো. সেলিমের মেয়ে সেলিনা, নরসিংদীর শিবপুরের জসিম উদ্দীনের স্ত্রী রিমা, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার সুজনের মেয়ে রিনা আক্তার, চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার হাছান উল্লাহর ছেলে পারভেজ, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার গোকুলের ছেলে মাহাবুব, গাজীপুরের সেলিম মিয়ার ছেলে রিপন মিয়া (ইয়াসিন), ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার মান্নান মাতবরের ছেলে নোমান মিয়া, নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার আবুল কাশেমের ছেলে রাসেদ, নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার এনায়েতের ছেলে বাদশা, ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার ইউসুফ, নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার আবুল বাসারের ছেলে জিহাদ, শাকিল, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের খোকনের স্ত্রী জাহানারা, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার কবিরের ছেলে মো. রাকিব, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থানার সুরুজ আলীর মেয়ে ফারজানা, কিশোরগঞ্জের চান মিয়ার ছেলে নাজমুল, কিশোরগঞ্জের বাস্তু মিয়ার ছেলে তাছলিমা, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার মো. রাকিব, নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার মো. বাহারের ছেলে মো. আকাশ, কিশোরগঞ্জের বাচ্চু মিয়ার মেয়ে তাছলিমা, কিশোরগঞ্জের আজিজুল হকের মেয়ে মোছা. রহিমা, গাইবান্ধার প্রফেসর কলোনির হাসানুজ্জামানের মেয়ে নুসরাত জাহান টুকটুকি, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি থানার চান্দু মিয়ার মেয়ে রাবেয়া, কিশোরগঞ্জের মালেকের মেয়ে মাহমুদা, নেত্রকোনার খালিয়াঝুড়ি উপজেলার আজমত আলীর মেয়ে তাকিয়া আক্তার, হবিগঞ্জের আব্দুল মান্নানের মেয়ে তুলি, কিশোরগঞ্জের নিজামউদ্দিনের মেয়ে শাহানা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার ফয়জুল ইসলামের ছেলে সাজ্জাদ হোসেন সজীব, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানার লালচু মিয়ার ছেলে লাবণ্য আক্তার।

গত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাশেম ফুডস লিমিটেডের কারখানার ছয়তলার একটি ভবনে ভয়াবহ আগুন লাগে। এতে প্রাণ হারান কারখানার ৫৩ জন শ্রমিক-কর্মচারী। ফায়ার সার্ভিস ও বেঁচে ফেরা শ্রমিকদের দেয়া তথ্য মতে, ভবনের নিচতলায় প্রথমে আগুন লাগে। নিচতলায় ছিল ফয়েল প্যাকেটসহ বিভিন্ন কার্টন। এসব দাহ্য পদার্থ হওয়ার কারণে মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভবনের অন্যান্য তলায়।

শ্রমিকদের অভিযোগ, আগুন লাগার কিছুক্ষণ পরই ভবনের দুটি দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। এর আগেই কিছু শ্রমিক কারখানা থেকে বেরিয়ে যান। আগুন ছড়িয়ে পড়লে ভীত-সন্ত্রস্ত শ্রমিকরা ভবন থেকে লাফিয়ে পড়েন ভবন থেকে। এই ঘটনায় আহত দুই নারীকে রাতেই পার্শ্ববর্তী ইউএস বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই মারা যান তারা। পরে গুরুতর আহত আরো এক পুরুষ শ্রমিক মারা যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

More News...

ওবায়দুল কাদেরের মস্তিষ্ক অলস-হৃদয় দুর্বল : রিজভী

ট্রেনে ঢাকায় ফিরছেন অনেকে, স্টেশনে ভিড়