কঠোর লকডাউন বাড়তে পারে আরও এক সপ্তাহ

কঠোর লকডাউন বাড়তে পারে আরও এক সপ্তাহ

দেশজুড়ে চলছে কঠোর লকডাউন। এটি আরও অন্তত এক সপ্তাহ বাড়বে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না এলে আসন্ন কোরবানির ঈদ পর্যন্তও চলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। করোনার বিস্তার রোধে গত ১ জুলাই বৃহস্পতিবার থেকে দেশজুড়ে এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউন শুরু হয়েছে। সেই হিসাবে এটি শেষ হবে ৭ জুলাই। শেষ হওয়ার আগেই এ লকডাউন আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সুপারিশে কমিটি দেশজুড়ে করোনা সংক্রমনের লাগাম টানতে কমপক্ষে ১৪ দিন ‘শাটডাউন’-এর সুপারিশ করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় চলমান এ লকডাউন।

এদিকে লকডাউনের সময়কাল যদি বৃদ্ধি পায়, তাহলে খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষের ভোগান্তি-দুর্দশা আরও দীর্ঘ হবে। এমনিতে চলমান লকডাউনে রুটি-রুজি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অসহায় ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে। ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে প্রশাসনের কাছে খাদ্য সহায়তা চাওয়ার কথা বলা হলেও বেশিরভাগ হতদরিদ্র মানুষই এ পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত নন। ফলে তারা ফোন করে খাদ্য সহায়তা চান না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, ৩৩৩ নম্বরে ফোন আসে খুবই কম। এমন অবস্থায় লকডাউনের সময়সীমা আরও বৃদ্ধি পেলে প্রান্তিক শ্রেণির এসব মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই আরও কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এ জন্য দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও দরিদ্র মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

লকডাউন যত বাড়বে, হতদরিদ্র মানুষের জীবন-জীবিকার সংগ্রামও ততই দীর্ঘায়িত হবে। করোনা সংক্রমণের হার এবং আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। গতকাল রবিবার দেশে রেকর্ড ১৫৩ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সময়ে ৮ হাজার ৬৬১ জন এ মহামারীতে আক্রান্তের খবর দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে কঠোর লকডাউন আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর বিকল্প কিছু দেখছেন না জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে এ পর্যন্ত চলমান লকডাউনের জন্য গত ২৮ জুন দুস্থ ও অসহায়দের খাদ্য সহায়তায় মাত্র ২৩ কোটি ৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। চলমান লকডাউনে সবকিছুই বন্ধ থাকার মধ্যে এ বরাদ্দ যৎসামান্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া এবার লকডাউনে রাজনৈতিক দল কিংবা অন্যান্য সামাজিক সংগঠনগুলোও খুব বেশি ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে না। ফলে দুস্থ মানুষ খুবই কষ্টে দিনাতিপাত করছে।

অপ্রতুল বরাদ্দ প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন বলেন, আসলে শুধু যারা পুরোপুরি কর্মহীন অবস্থায় আছে, ঘরে খাবার নেই তাদের জন্যই এ বরাদ্দ দিয়েছি। এ বরাদ্দের আওতায় রিকশা শ্রমিক আসে না। কারণ তারা টুকটাক আয় করছে। এ ছাড়া পণ্যবাহী পরিবহন শ্রমিকদের আয় বন্ধ নেই। শুধু যেসব গণপরিবহন পুরোপুরি বন্ধ, সেসব পরিবহনের শ্রমিক এবং সমাজের দুস্থ, দিনমজুরদের মধ্যে এ বরাদ্দ দিতে বলা হয়েছে। ত্রাণ হিসাবে ১ লাখ ২৩ হাজার ৮০৬ টন খাদ্য সহায়তা এবং নগদ ১১ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি বুঝে সরকার প্রয়োজনীয় আরও সিদ্ধান্ত নেবে।

সচিব আরও বলেন, যারা একেবারেই কর্মহীন, সঞ্চয় নেই তাদের জন্যই ত্রাণ। কিন্তু যাদের সঞ্চয় আছে, চলার মতো অবস্থা আছে তাদের ত্রাণ দেওয়া তো সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রকৃত দুস্থ ও অসহায় কেউই খাবারের সংকটে থাকবে না। সরকার এ বিষয়ে সচেষ্ট রয়েছে।

খাবারের কষ্টে আছেন জানিয়ে কেউ ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে খাদ্য সহায়তা চাইলে সহায়তা পাবেন বলে জানাচ্ছে বিভিন্ন জেলা প্রশাসন। কিন্তু অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী ৩৩৩ নম্বরের সঙ্গে খুব একটা পরিচিত নয়। তাদের বেশিরভাগ মানুষই ফোন করে খাদ্য সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি জানেন না। ফলে এসব হতদরিদ্র মানুষ কাজ হারিয়ে না খেয়েই দিনাতিপাত করছে। গত কয়েকদিন সরেজমিন ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য মিলেছে।

গত বৃহস্পতিবার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের এমপি গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলেছেন, লকডাউনে কর্মহীন মানুষের খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারিভাবেই। এমন দুঃসময়ে সরকারকে অবশ্যই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি বিত্তবানদের উচিত হবে অতিমারী করোনাকালে হতদরিদ্র ও ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তিনি আরও বলেন, লকডাউনের কারণে যদি একটি শিশুও ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদে ও একটি মানুষও না খেয়ে থাকে, তা হবে বেদনাদায়ক। অভুক্ত থেকে কেউ যদি মারা যায়, তা হবে জাতির জন্য কলঙ্কজনক। তাই লকডাউনে ক্ষুধার্ত মানুষের প্রতি সবাইকে সহানুভূতিশীল হতে হবে।

গত ২৮ জুন সোমবার কোভিড-১৯ মোকাবিলায় লকডাউন চলমান থাকায় দরিদ্র, দুস্থ, অসচ্ছল ও কর্মহীন জনগোষ্ঠীর মাঝে মানবিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে দেশের ৬৪টি জেলার অনুকূলে ২৩ কোটি ৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মানবিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে এ বরাদ্দ প্রদান করা হয়। মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, বরাদ্দের শর্তানুযায়ী সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা বরাদ্দকৃত অর্থ ইউনিয়ন ভিত্তিক উপ-বরাদ্দ প্রদান করবেন। ৩৩৩ নম্বরে ফোন করলে মানবিক সহায়তা পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের এ বরাদ্দ থেকে খাদ্য সহায়তা যেমন- চাল, ডাল, তেল, লবণ, আলু ইত্যাদি প্রদান করতে হবে বলে বরাদ্দপত্রে উল্লেখ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কঠোর এই লকডাউনে এত অল্প পরিমাণ বরাদ্দ দিয়ে সবার চাহিদা মিটবে না। কারণ রিকশাচালক ছাড়া শুধু পরিবহন খাতেই প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক করোনায় ঘরে বসে আছে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে খাবার দিতে সরকারকে বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে এবং প্রত্যেক শ্রমিকের খোঁজ নিতে হবে। অন্যথায় না খেয়ে মরবে এসব শ্রমজীবী মানুষ।

এদিকে ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে খাদ্য সহায়তা চাইতে অসহায় মানুষকে অনুরোধ জানাচ্ছে বিভিন্ন জেলা প্রশাসন। নোয়াখালী জেলা প্রশাসনের একটি লিফলেটে বলা হয়েছে, কোভিড ১৯-এর বিস্তাররোধে নোয়াখালী জেলায় আরোপিত লকডাউনের কারণে কারও খাদ্যসামগ্রীর প্রয়োজন হলে ০১৭০৫৪০১০০০ নম্বরে নাম, ঠিকানা (উপজেলার নামসহ), জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরসহ এসএমএস করুন অথবা ৩৩৩ নম্বরে ফোন করুন। এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান বলেন, লকডাউনে বেশিরভাগ শ্রমজীবী মানুষেরই কাজ বন্ধ। তাদের তালিকা ধরেই আমরা খাদ্য সহায়তা দেওয়া শুরু করেছি। আমরা পরিবহন শ্রমিক ও রিকশাচালকদের সমিতি থেকে তাদের তালিকা নিচ্ছি। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের কাছ থেকে দিনমজুরদের তালিকা সংগ্রহ করে সবাইকে ত্রাণের আওতায় আনা হচ্ছে।

৩৩৩ নম্বরে ত্রাণপ্রত্যাশীদের কেমন ফোন পাচ্ছেন? এমন প্রশ্নে ডিসি বলেন, আমরা প্রচুর ফোন পাচ্ছি। শনিবার একদিনেই আমরা ৬৮২ জনের ফোন পেয়ে তাদের খাদ্য সহায়তা দিয়েছি। আমরা নগদ টাকা ও চাল দিচ্ছি। প্রত্যেককে ১০ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ২ লিটার তেল, ১ কেজি লবণ, ১০০ গ্রাম গুঁড়া হলুদ, ১০০ গ্রাম গুঁড়া মরিচ- এভাবে প্যাকেট করে দিচ্ছি। নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক আরও বলেন, যারা ৩৩৩ নম্বরের ফোন দেওয়ার বিষয়টি বোঝে না, তারা এলাকার অন্য মানুষের সহযোগিতায় ফোন দিচ্ছে। আমরা লকডাউনে অভাবগ্রস্ত প্রত্যেকের ঘরে সরকারের খাদ্য সহায়তা পৌঁছানোর বিষয়ে সচেষ্ট আছি।

লালমনিরহাটের ডিসি মো. আবু জাফর বলেন, আমরা দরিদ্রদের খাদ্য সহায়তায় ২৩০ টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দিয়েছি। তিনি বলেন, গত ২৮ জুন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, এ সংক্রান্ত কোনো চিঠি এখনো আমরা পাইনি। খাদ্য সহায়তা চেয়ে ৩৩৩ নম্বরে অসহায় মানুষরা ফোন করছে কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ফোন কম পাচ্ছি। তবে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ ঠিকই চলছে।

More News...

ওবায়দুল কাদেরের মস্তিষ্ক অলস-হৃদয় দুর্বল : রিজভী

ট্রেনে ঢাকায় ফিরছেন অনেকে, স্টেশনে ভিড়